Image default
জীবনী

আলফ্রেড নোবেল এর জীবনী

আলফ্রেড নোবেল ছিলেন একজন সুয়ডিশি রসায়নবিদ, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক এবং অস্ত্র নির্মাতা। তিনি ডিনামাইট আবিষ্কার এর জন্য বিখ্যাত । আলফ্রেড নোবেল ব্যবসায়েও বিশেষ প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন । তিনি বিখ্যাত ইস্পাত নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোফোর্স এর মালিক ছিলেন । আলফ্রেড নোবেল প্রতিষ্ঠানটিকে এক সময় অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন । তার নামে ৩৫০টি ভিন্ন ভিন্ন পেটেন্ট ছিল যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে ডিনামাইট  । মৃত্যুর আগে উইল করে তিনি তার সমস্ত অর্থ নোবেল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য রেখে যান । আলফ্রেড নোবেল এর উইল অনুযায়ী প্রতি বছর সাহিত্য, শান্তি, পদার্থ, রষায়ন ও চিকিৎসায় অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরুষ্কার প্রদান করা হয় ।

আজ আমরা আলফ্রেড নোবেল এর জীবনী নিয়ে আলোচনা করবো

এক নজরে
নামআলফ্রেড নোবেল
জন্ম২১ অক্টোবর ১৮৩৩
পিতাইমানুয়েল নোবেল
মাতাক্যারোলিনা নোবেল
জন্মস্থানস্টকহোম, সুইডেন
জাতীয়তাসুইডিশ
পেশারসায়নবিদ, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক, ব্যবসায়ী, সমাজসেবী
মৃত্যু১০ ডিসেম্বর ১৮৯৬ , ৬৩ বছর বয়সে

 

আলফ্রেড নোবেল এর জন্ম

আলফ্রেড নোবেল ১৮৩৩ সালের ২১ অক্টোবর স্টকহোম, সুইডেনে জন্মগ্রহণ করেন । আলফ্রেড নোবেলের পিতার নাম ছিল ইমানুয়েল নোবেল । তিনি গোলাবারুদের বিস্ফোরক তৈরির ব্যবসা করতেন । আলফ্রেড নোবেলের মাতার নাম ছিল ক্যারোলিনা ।

আলফ্রেড নোবেল এর বাল্য জীবন

নয় বছর বয়সে আলফ্রেড পরিবারের সঙ্গে রাশিয়ার লেনিনগ্রাদে বসবাস শুরু করেন। তার পিতা ইমানুয়েল ছেলেকে বিজ্ঞান শিক্ষা দেবার জন্য স্কুলে না পাঠিয়ে গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে রেখেছিলেন । পিতার আগ্রহে ও গৃহশিক্ষকের চেষ্টায় আলফ্রেড নোবেল অল্পবয়সেই রসায়ন বিদ্যায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন । আলফ্রেড নোবেল কোনদিন স্কুল কিংবা কলেজে পড়াশোনা করেন নি। আলফ্রেড নোবেল এর যাবতীয় শিক্ষা লাভ হয়েছিল গৃহে, গৃহ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ।

সেই কারণে প্রথম থেকেই তার জীবন ছিল নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা এবং সুশৃঙ্খল। তিনি কখনো ধূমপান করতেন না এবং মদও খেতেন না । তিনি ফ্রেঞ্চ, জার্মান, রাশিয়ান ও ইংরাজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন । সমাজবিজ্ঞানেও তাঁর যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। এছাড়াও তিনি বেশ কয়েকটি নাটক, গল্প ও উপন্যাস লিখেছিলেন । পরে অবশ্য রসায়নের গবেষণাতেই তিনি পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন ।

আরো পড়ুন

মাইকেল মধুসূদন দত্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী
আলফ্রেড নোবেল এর কর্ম জীবন

১৯৫০ সালের পরে তিনি পিতার কোম্পানিতে “Foundries and Machine Shops of Nobel and Sons” যোগ দেন । জানা যায়, ১৯৫৩ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে তাঁদের কোম্পানি থেকে যুদ্ধের বহু অস্ত্র – শস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল । একসময় তাদের কোম্পানির আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়লে আলফ্রেড ও তাঁর পিতা ইমানুয়েল সুইডেনে ফিরে আসেন । এখানে আলফ্রেড নোবেল  শুরু করেন নানা বিষয়ে গবেষণা ।

ডিনামাইট আবিষ্কার

সেই সময় খনির কাজে  সৈন্যবিভাগে একপ্রকার কালো বিস্ফোরক পদার্থ ব্যবহার করা হত । এই বিস্ফোরক পদার্থের নাম ছিল নাইট্রো – গ্লিসারিন । এই পদার্থটি ছিল খুবই বিপজ্জনক বিস্ফোরক । একে নিরাপদে ব্যবহার করা যায় কিভাবে, সেটার কোন উপায় তখনো পর্যন্ত জানা ছিল না । আলফ্রেড এই বিষয়ে গবেষণা শুরু করলেন । অল্পসময়ের মধ্যেই তিনি নাইট্রো – গ্লিসারিনের সঙ্গে একটি চক জাতীয় পদার্থ মিশিয়ে আবিষ্কার করলেন সুষ্ঠুভাবে ও নিরাপদে বিস্ফোরণ ঘটাবার কৌশল । তিনি এই বিস্ফোরকটির নাম দিলেন ডিনামাইট ।

এর পর থেকেই ডিনামাইটের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে লাগল । তিনি বিভিন্ন ধরনের ডিনামাইট বাজারে ছাড়তে লাগলেন । ফলে ব্যবসা বাড়তে লাগলো । ব্যবসা দেখতে দেখতে ফুলে ফেঁপে উঠল । ১৮৯৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার  ৯৩ টি কারখানায় ৬৬ হাজার ৫০০ টন বিস্ফোরক পদার্থ উৎপাদিত হত । ডিনামাইটের ব্যবসা থেকে বিপুল পরিমান অর্থ উপার্জন করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল ।

মানুষ হিসেবে আলফ্রেড নোবেল ছিলেন অত্যন্ত উন্নত মানের ।তিনি তার কারখানার শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার জন্য অনেক উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন । আলফ্রেড নোবেল বিশ্বাস করতেন যে শান্তি ও সংহতিই হতে পারে এই বিশ্বের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র চাবিকাঠি । তিনি জানতেন আর্ন্তর্জাতিক ভাব বিনিময় ও ভ্রাতৃত্ববোধই আনতে পারে আন্তর্জাতিক সংহতি । এবং প্রতিষ্ঠিত হতে পারে স্থিতিশীলতা ।

নোবেল পুরষ্কার প্রবর্তন

বিশ্বে শান্তি স্থাপনের জন্য এবং সৃজনশীল কর্মোদ্যোগকে উৎসাহিত করার নিমিত্তে তিনি একটি পুরস্কার প্রবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন । ১৮৯৫ সালে প্যারীতে বসবাসকালে তিনি একটি উইল রচনা করেন । সেই উইল অনুসারে প্রতিবছর পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন বিদ্যা, সাহিত্যকর্ম, বিশ্বশান্তির ক্ষেত্রে অবদানের জন্য পুরস্কার প্রদান করা হয় । পুরস্কার দাতার নাম অনুসারেই পুরস্কারের নামকরণ করা হয় । আলফ্রেড নোবেল এর নাম অনুসারে ১৮৯০ সালে গঠিত হয় নোবেল ফাউন্ডেশান ।

আরো পড়ুন

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী

এই ফাউন্ডেশান স্বাধীন ও বেসরকারীভাবে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান ও অর্থ সংরক্ষণের বিষয়টি দেখে থাকেন। মৃত্যুর একবছর আগে ১৮৯৫ সালের ২৭ শে নভেম্বর আলফ্রেড উইলটি করেছিলেন । তাতে তিনি বিস্তারিতবাবে উল্লেখ করেছেন কিভাবে তাঁর বিপুল সম্পত্তি ব্যবহার করা হবে । তিনি লিখেছেন: একটি তহবিল গঠন করে যথাযোগ্য নিরাপত্তার মধ্যে আমার অর্থ সংরক্ষিত থাকতে হবে । আমার অর্জিত অর্থ থেকে যে পরিমাণ সুদ পাওয়া যাবে, তা থেকে প্রতিবছর কয়েকটি পুরস্কার দেওয়া হবে । পুরস্কার নির্দিষ্ট থাকবে মানবজাতির উন্নয়নে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য। সুদের টাকা পাঁচ ভাগ করে একভাগ পদার্থবিদ্যায় আবিষ্কার, একভাগ রসায়নবিদ্যায় আবিষ্কার আর একভাগ শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্রে নতুন অবদান, একভাগ সাহিত্যক্ষেত্রে অনন্যসাধারণ অবদানের জন্যে এবং একভাগ আন্তর্জাতিক শান্তিস্থাপন ও নিরস্ত্রীকরণের জন্য প্রধান ভূমিকা পালনকারীকে প্রদান করা হবে ।

রয়াল সুইডিশ আকাদেমি অব সায়েনসেস পদার্থবিদ্যা ও রসায়নবিদ্যার পুরস্কারটি দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে। চিকিৎসাশাস্ত্রের পুরস্কারটি স্টকহোমের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের বিবেচনাধীন থাকবে । সাহিত্যের পুরস্কারটির দায়িত্বে থাকবে সুইডিশ একাডেমি । আর নরওয়ের সংসদ মনোনয়ন করবেন শান্তি পুরস্কারের প্রার্থী । এই পুরস্কার কখনই কোন প্রার্থী কোন দেশের এই প্রশ্নের ওপর নির্ভর করবে না ।

আলফ্রেড নোবেল তাঁর উইলে আরও উল্লেখ করেন, এই পুরস্কার কোন সময় যুক্তভাবে তিনজনের বেশি কাউকে দেওয়া যাবে না । আলফ্রেড নোবেল এর উইল অনুসারে প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় । তবে তার আগে অক্টোবর মাসেই একাডেমি পুরস্কার প্রাপকদের নাম ঘোষণা করেন । ১৯৩৯ সাল থেকে আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতি রক্ষার্থে অর্থবিজ্ঞানেও এই পুরস্কার সংযোজন করা হয়েছে । বর্তমানে প্রতিটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২৬ লক্ষ ডলার। এমন মোটা অঙ্কের পুরস্কার পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই । ১৯০১ সাল থেকে এই পুরস্কার প্রদান করা শুরু হয় । আলফ্রেড নোবেলের জীবদ্দশায় নোবেল পুরস্কার কাউকে প্রদান করা হয়নি ।

আলফ্রেড নোবেল এর মৃত্যু:

১৮৯৬ সালের ১০ ই ডিসেম্বর অ্যানজাইলা পেক্টোরিস ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে আলফ্রেড নোবেল মৃত্যু বরণ করেন । মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর ।

Related posts

স্টিভ জবস এর জীবনী

jibondharaa

বেগম রোকেয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী

jibondharaa

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংক্ষিপ্ত জীবনী

jibondharaa

Leave a Comment